
রাজধানীর অলিগলিতে কিংবা শিল্পাঞ্চলের ঘামে ভেজা বাতাসে এখন একটাই দীর্ঘশ্বাস—নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই চিরচেনা রূপটি যেন আজ আরও বেশি নির্মম হয়ে ধরা দিয়েছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে। দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকের অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে উঠে আসা এক মর্মান্তিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, গত মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে প্রায় দেড়গুণ। অথচ এই বর্ধিত ব্যয়ের বিপরীতে তাদের মাসিক আয় রয়ে গেছে সেই একই বিন্দুতে, যা তাদের টিকে থাকার লড়াইকে করে তুলেছে এক অসম্ভব সমীকরণ। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অগ্নিমূল্যের বাজারে নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের পাতে আমিষ তো দূরের কথা, দুবেলা ডাল-ভাত জোটাতেই এখন নাভিশ্বাস উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মাছ-মাংসের দোকানগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় থমকে দাঁড়ানো যেন এখন এক অপরাধের শামিল। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এক শ্রমিকের কণ্ঠে ঝরে পড়ে এক বুক চাপা কান্না ও হাহাকার, 'দুই মাস হইছে, মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি।' এই একটিমাত্র বাক্য যেন পুরো দেশের লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের প্রতিদিনের নীরব অনাহার ও বঞ্চিত জীবনের এক জীবন্ত দলিল। যারা কায়িক পরিশ্রমে দেশ সচল রাখেন, কলকারখানার চাকা ঘোরান, তাদেরই পাতে আজ পুষ্টিকর খাবারের জোগান তো দূরের কথা, উদরপূর্তির ভাতটুকুই বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। আমিষের জোগান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব পরিবারের শিশু ও বয়স্ক সদস্যরা নানা ধরনের পুষ্টিহীনতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের এক নীরব মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
শ্রমিকদের এই দুরবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে গত কয়েক মাসে লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। একবাক্যে প্রায় সব শ্রমিকেরই অভিযোগ, জ্বালানি ও ইউটিলিটি সার্ভিসের এই মূল্যবৃদ্ধি তাদের ঘরের সমস্ত হিসাব-নিকাশলকে ওলটপালট করে দিয়েছে। বাসাভাড়া থেকে শুরু করে রান্নার খরচ—সবকিছুর পেছনেই টান পড়েছে। গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে অনেক পরিবারে এখন কাঠ বা কেরোসিনের চুলায় রান্না করার পুরনো কষ্টকর দিনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে গিয়ে হাতঘড়ির শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ, যা তাদের জীবনযাত্রাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি কেবল নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রাকেই প্রভাবিত করছে না, বরং এটি সমাজে বৈষম্যের পরিধি আরও বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত সমাজ যেখানে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নিম্নবিত্ত বা দিনমজুর শ্রেণির মানুষগুলো সরাসরি দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। আয়ের সাথে ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধান ঘোচাতে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ বা ভর্তুকির পরিধি না বাড়ানো হলে এই বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী চরম সামাজিক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যেখানে কেবল সহানুভূতি প্রকাশ নয়, প্রয়োজন সময়োপযোগী ও কঠোর বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা। টিসিবি বা খোলা বাজারে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল, যা দূরদূরান্তের প্রান্তিক শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায় না বললেই চলে। সময় এসেছে শ্রমজীবী মানুষের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজার ও ইউটিলিটি সার্ভিসের দাম একটি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। অন্যথায়, 'মাছের গন্ধ ভুলে যাওয়া' এই মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেই একসময় প্রশ্নবিদ্ধ করবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দৈনিক সুনামগঞ্জ সংবাদ | Dainik Sunamganj Sangbad. ফোনঃ +8801738462523 ইমেইলঃ sunamganjsangbad@gmail.com
©২০২৬ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | Presented by ITFaire