
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জয়জয়কার চলায় বাংলাদেশও এখন আর পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো আন্তর্জাতিক মানের এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা থাকলেও বাংলা ভাষার সূক্ষ্ম অলঙ্কার, আঞ্চলিক বিবর্তন এবং প্রায়োগিক বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সেগুলোতে এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। এই শূন্যতা পূরণে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব ‘বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (এলএলএম) তৈরির এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্ভুল এআই ইঞ্জিন তৈরি করা, যা কেবল সরকারি সেবা নয়, বরং সাধারণ নাগরিকের প্রাত্যহিক ডিজিটাল অভিজ্ঞতায় আমূল পরিবর্তন আনবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ডেটা বা উপাত্তকে নতুন যুগের ‘তেল’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, আর সেই ডেটা ব্যবহারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ তার ভাষাগত সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে চাইছে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল একটি সফটওয়্যার তৈরির বিষয় নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে বিশাল অংকের বিনিয়োগ এবং উচ্চমানের কারিগরি সক্ষমতা।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আইসিটি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) সম্মিলিতভাবে এই ‘বাংলা এআই’ নির্মাণের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছে। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র অনুযায়ী, এই মডেলটি তৈরিতে কয়েক বিলিয়ন বাংলা বাক্য বা টোকেন ব্যবহার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে সাহিত্যের ধ্রুপদী কর্ম থেকে শুরু করে আধুনিক দাপ্তরিক নথি এবং প্রাত্যহিক কথোপকথন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ২০৪১ রূপকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম স্তম্ভ হবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশেষ করে আইন-আদালত, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃষি খাতের জন্য বিশেষায়িত বাংলা এআই মডিউল তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে যদি একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যায়, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও সহায়ক হবে। তবে এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কেবল ঘোষণা বা নথিপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন।
চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ল্যাব বা সুপার কম্পিউটিং অবকাঠামোর বিষয়টি। এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বর্তমানে এনভিডিয়া বা এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি অত্যাধুনিক জিপিইউ (গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট) প্রয়োজন, যার জন্য প্রয়োজন কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কথা মাথায় রেখে এই বিশাল বিনিয়োগ কতটুকু যৌক্তিক বা সম্ভব, তা নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত মত রয়েছে। তদুপরি, এই ধরণের মেশিন চালানোর জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ এবং শীতলীকরণ (কুলিং) ব্যবস্থার প্রয়োজন, তা আমাদের বর্তমান ডেটা সেন্টারগুলোর সক্ষমতার বাইরে কিনা সেই প্রশ্নটিও জোরালো। সরকারের পক্ষ থেকে আইটি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করা হলেও একটি সমন্বিত রোডম্যাপ এখনো জনসম্মুখে স্পষ্ট নয়। অবকাঠামো ছাড়াও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনবল; কারণ লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল অপ্টিমাইজ করার জন্য যে উচ্চপর্যায়ের ডেটা সায়েন্টিস্ট ও ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন, তাদের বড় একটি অংশই বর্তমানে দেশের বাইরে কর্মরত রয়েছেন।
সাধারণ মানুষের ওপর এই প্রকল্পের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ইংরেজি ভাষায় সাবলীল না হওয়ায় ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হন। যদি একটি কার্যকর বাংলা এআই তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে একজন সাধারণ কৃষক কেবল কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে তার ফসলের রোগবালাই সম্পর্কে তাৎক্ষণিক সমাধান পাবেন। তেমনিভাবে, একজন শিক্ষার্থী জটিল কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তার মাতৃভাষায় অনেক সহজভাবে বুঝতে সক্ষম হবে। সরকারি অফিসগুলোতে ফাইলের স্তূপ কমাতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এআই-ভিত্তিক অটোমেশন বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু চ্যাটবট সরকারি সাইটগুলোতে কাজ করলেও সেগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষ আশা করছে, সরকারের এই নতুন উদ্যোগটি কেবল প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যেন বাস্তবে নাগরিক সেবার মান উন্নত করে। তবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তথ্য গোপনীয়তা বা ডেটা প্রাইভেসি যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সে বিষয়েও জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয় হিসেবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারকে কেবল এককভাবে কাজ না করে দেশের বেসরকারি খাত এবং স্টার্টআপগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেল অনুসরণ করলে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমে এবং উদ্ভাবন ত্বরান্বিত হয়। এছাড়া বাংলা এআই-এর জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ল্যাবগুলোকে সক্রিয় করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এআই কোনো বিলাসিতা নয় বরং এটি ভবিষ্যতের টিকে থাকার লড়াই। তবে এই যাত্রায় সফল হতে হলে আমাদের অবশ্যই স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং নৈতিক এআই (Ethical AI) ব্যবহারের নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি শক্তিশালী এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, বরং বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি রপ্তানিকারক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। পরিশেষে বলা যায়, সরকারের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় পাথেয় হবে সঠিক কৌশল, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং দেশীয় মেধার সঠিক মূল্যায়ন।
দৈনিক সুনামগঞ্জ সংবাদ | Dainik Sunamganj Sangbad. ফোনঃ +8801738462523 ইমেইলঃ sunamganjsangbad@gmail.com
©২০২৬ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | Presented by ITFaire