
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ এবং এর ফলে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে এই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা কার্যকর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন তিনি। গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এই শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্যাবলি তুলে ধরা হয়। বৈঠকে দুই নেতাই এ উপলক্ষে ঘোষিত বড় ধরনের বিনিয়োগ উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।
দুই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং আইসিটি অবকাঠামোর উন্নয়ন একযোগে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এর মাধ্যমে শিল্প মূল্য শৃঙ্খলের একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য ও সরবরাহের একটি প্রধান প্রবেশদ্বার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ কাঠামোর আওতায় দুই দেশ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে একটি বৃহৎ শিল্প অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। উৎপাদন, খাদ্য ও কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে পরিপূরক ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুই নেতা একমত হন। দ্বিপক্ষীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল রূপান্তর, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের গুরুত্ব স্বীকার করেন দুই নেতা। এ সহযোগিতার আওতায় জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টেকসই নগর উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসই উপায়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়েই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব বলে দুই নেতা একমত হন।
আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে একমত প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তাঁরা ঢাকায় এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার করা হয়। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় আরও অগ্রগতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন। মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি এর আঞ্চলিক নিরাপত্তাগত প্রভাব, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যাকে দুই নেতা যৌথভাবে স্বাগত জানান। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ উদ্যোগের চারটি অগ্রাধিকার হলো-যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ। এতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া সহজ, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম হবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমানের সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের অধিকতর উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুত ইয়েন ঋণ প্রকল্পটিকেও দুই নেতা স্বাগত জানান। করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ এবং লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেন তারেক রহমান।
ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতি অব্যাহত রাখতে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের যৌথ আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। দুই নেতা জাপান-বাংলাদেশ যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম পর্যালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়ে দুই নেতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পের বহুমুখীকরণে জোর দেওয়ার ঘোষণা দেন। এছাড়া আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের অনুরোধ নিয়ে আরও আলোচনার কথা জানান তাকাইচি। উভয় নেতা একটি অবাধ, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখার তাগিদ দেন।
জাপানের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় দ্বিপক্ষীয় আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এটি ‘পার্টনারশিপ অন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া’ বা ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের একটি অন্যতম অংশ। বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান কমাতে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের সহায়তার ধারা বজায় থাকবে। জাপানের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সরকারগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইয়েন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ-২)’ প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে দুই নেতা স্বাগত জানান।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তেলের মজুত বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষরিত হয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ডিজিটাল রূপান্তরে কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমার সংকট।
দুই প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতিগুলোর প্রতি তাঁদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বেসামরিক জাহাজ ও নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তাঁরা সামুদ্রিক কর্মীদের জীবন বিপন্ন করতে পারে এমন যেকোনো সংঘাতমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তাঁরা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধ পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁরা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং রোহিঙ্গাসহ সব পক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংলাপের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বৈঠকে তাঁকে বিশেষ অভিনন্দন জানান জাপানি প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ইস্যুর পাশাপাশি অপহরণ সমস্যারও অবিলম্বে নিষ্পত্তির আহ্বান জানান দুই নেতা।
সফরের সমাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং জাপানি জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য গভীর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
দৈনিক সুনামগঞ্জ সংবাদ | Dainik Sunamganj Sangbad. ফোনঃ +8801738462523 ইমেইলঃ sunamganjsangbad@gmail.com
©২০২৬ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | Presented by ITFaire