
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা। আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, ইরান তার দুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির আশেপাশে অভাবনীয় মাত্রায় নতুন নির্মাণকাজ শুরু করেছে। কেবল নতুন অবকাঠামো তৈরিই নয়, বরং মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পুরোনো স্থাপনাগুলোও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সংস্কার করা হচ্ছে। এই তৎপরতা এমন এক সময়ে নজরে এল, যখন তেহরানের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের পারমাণবিক ও সামরিক উত্তেজনা তুঙ্গে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই কর্মযজ্ঞ কেবল প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোই নয়, বরং ভবিষ্যতে বড় কোনো সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই নির্মাণযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের শাহরুদ এবং খোজির মিসাইল প্রোডাকশন কমপ্লেক্স। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সেখানে কয়েক ডজন নতুন ভবন ও ভূগর্ভস্থ টানেল তৈরি করা হচ্ছে। গত বছর ইসরায়েলি ড্রোন বা বিমান হামলায় এসব অঞ্চলের বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু ইরান এখন সেই ক্ষত মুছে ফেলে দ্বিগুণ শক্তিতে স্থাপনাগুলো পুনঃনির্মাণ করছে। বিশেষ করে মাটির নিচে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা ইরান গড়ে তুলেছে, তা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আধুনিক করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সরাসরি নির্দেশ করে যে, ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে আরও সুরক্ষিত ও গোপনীয় করতে চায়।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই বিশেষ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাওয়া বিশালকার ‘বার্ম’ বা মাটির ঢিবি এবং উন্নত প্রতিরক্ষা দেয়ালগুলো প্রমাণ করে যে, ইরান এখানে অত্যন্ত দাহ্য এবং শক্তিশালী জ্বালানি চালিত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত গড়ছে। এই ধরণের নির্মাণ সাধারণত বড় কোনো সমরাস্ত্র কারখানার চারপাশেই দেখা যায়। ইরানের এই দ্রুতগতির অবকাঠামো উন্নয়ন কেবল তাদের আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টাই নয়, বরং ইসরায়েল বা আমেরিকার কোনো সম্ভাব্য অতর্কিত হামলা ঠেকানোর জন্য একটি শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ ঢাল তৈরির প্রক্রিয়া মাত্র।
পশ্চিম এশীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচী সবসময়ই একটি তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করে। নতুন এই নির্মাণকাজের ফলে ইসরায়েলের সামরিক কৌশলবিদরা নতুন করে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ইরান কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যাই বাড়াচ্ছে না, বরং তাদের পাল্লা ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের ক্ষমতাও উন্নত করছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাওয়া লজিস্টিক সাপোর্ট সেন্টার এবং নতুন এয়ার-ডিফেন্স ব্যাটারিগুলোর অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান এখন যেকোনো পাল্টা হামলা মোকাবিলায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আদতে একটি নীরব সতর্কবার্তা, যা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে ইরানের এই পদক্ষেপকে পারমাণবিক চুক্তির মৃতপ্রায় অবস্থার সাথে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান কীভাবে এত বড় মাপের সামরিক নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ইরান রাশিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে। এই নবনির্মিত ঘাঁটিগুলো ভবিষ্যতে কেবল ইরানের নিজস্ব সুরক্ষাই দেবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোর জন্যও একটি নিরাপদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে এই নির্মাণকাজ কেবল একটি অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়, বরং এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের পূর্বাভাস।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে চলমান এই বিশাল নির্মাণকাজ বিশ্বশক্তির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের দামামা হয়তো এখনই সরাসরি বাজছে না, কিন্তু মাটির নিচের এই প্রস্তুতিগুলো ভবিষ্যতের কোনো এক ভয়াবহ সংঘাতের ইঙ্গিতবাহী। স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়া এই প্রতিটি ইট এবং কংক্রিটের কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তেহরান যদি তাদের এই সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে, তবে তা কেবল ইসরায়েল বা আমেরিকার জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্য একটি নতুন সামরিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটাবে। এই মুহূর্তে বিশ্ববাসীর চোখ এখন ইরানের সেই রহস্যময় মরুপ্রান্তরের দিকে, যেখানে দিনরাত চলছে আধুনিক রণকৌশলের নতুন মহড়া।
দৈনিক সুনামগঞ্জ সংবাদ | Dainik Sunamganj Sangbad. ফোনঃ +8801738462523 ইমেইলঃ sunamganjsangbad@gmail.com
©২০২৬ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | Presented by ITFaire