
গত মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর কেবল বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। এই সফরে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় প্রাধান্য পেয়েছে জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প 'বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট' বা বিগ-বি (BIG-B) উদ্যোগ। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক করিডোরটি এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার আবর্তে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ও সংশ্লিষ্ট নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এত বড় একটি সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং তাতে জাপানের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভাবনায় কেন সংশয়ের সৃষ্টি করছে, তা নিয়ে এখন কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
মাতারবাড়ি শুধু একটি বন্দর নয়; এটি বঙ্গোপসাগরের বুকে এক বিশাল কৌশলগত গেটওয়ে। গভীর সমুদ্র বন্দর হওয়ায় এখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজগুলো সরাসরি ভিড়তে পারবে, যা এতদিন সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা পোর্ট কেলাংয়ের ওপর নির্ভর করে করতে হতো। জাপানের 'বিগ-বি' প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বেল্টকে একটি শক্তিশালী শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর করা। এই বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ভারত কিছুটা হলেও কৌশলগত অস্বস্তিতে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ভারতের একটি নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় বা প্রভাব রয়েছে। মাতারবাড়িতে জাপানের মতো একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তির এই অতি-উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের সাথে তাদের এই গভীর অংশীদারিত্বকে নয়াদিল্লি তাদের দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক প্রভাবের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কি না, সেই প্রশ্নটি এখন জোরালোভাবে সামনে আসছে।
ভারতের এই সংশয়ের পেছনে রয়েছে গভীর ভৌগোলিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। মাতারবাড়ি বন্দরটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর খুব কাছাকাছি অবস্থিত। সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই বন্দরটি শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। যদিও বাংলাদেশ সরকার সবসময়ই স্পষ্টভাবে বলে আসছে যে তাদের বৈদেশিক নীতি সবার সাথে বন্ধুত্বের এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এটি পরিচালিত নয়, তবুও নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকরা এই মেগা প্রকল্পের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশেষ করে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) প্রভাবে যখন এ অঞ্চলের বন্দরগুলো নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে, তখন জাপান ও বাংলাদেশের এই যৌথ উদ্যোগ ভারতের মনে বাড়তি সতর্কতার জন্ম দিয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর এবং যৌথ ঘোষণায় ভারতের এই উদ্বেগের একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। জাপান নিজেই ভারতের একটি পরীক্ষিত এবং বিশ্বস্ত কৌশলগত অংশীদার। কোয়াড (QUAD) জোটের সদস্য হিসেবে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একসাথে কাজ করছে। ফলে, মাতারবাড়ি প্রকল্পে জাপানের সম্পৃক্ততা আদতে ভারতের নিরাপত্তার পরিপন্থী না হয়ে বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে পারে। ঢাকা ও টোকিওর যৌথ ঘোষণায় আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর যে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, তাতে শেষ পর্যন্ত ভারতও অংশীদার হতে পারে বা এই প্রকল্পের সুফল ভোগ করতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক আশা প্রকাশ করছেন।
পরিশেষে বলা যায়, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে ভারতের এই সংশয় রাতারাতি দূর হবে না, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতির একটি দীর্ঘমেয়াদী বাস্তবতার অংশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক টোকিও সফর এবং বিগ-বি প্রকল্পের নতুন রূপরেখা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এখন কেবল আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নীরব দর্শক নয়, বরং নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় অত্যন্ত পরিপক্ব ও সক্রিয় খেলোয়াড়। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশকে যেমন একদিকে জাপানের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে, তেমনি অন্যদিকে ভারতের সাথে আস্থার সম্পর্ক বজায় রেখে সুকৌশলে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আগামী দিনে মাতারবাড়ির বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে এই অঞ্চলের কূটনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দৈনিক সুনামগঞ্জ সংবাদ | Dainik Sunamganj Sangbad. ফোনঃ +8801738462523 ইমেইলঃ sunamganjsangbad@gmail.com
©২০২৬ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | Presented by ITFaire