
বাংলাদেশের শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে গত বেশ কিছুদিন ধরে এক অভূতপূর্ব ও সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের সীমানা থেকে আসা প্রায় ১৩০টিরও বেশি বন্য হাতির একটি বড় দল কাঁটাতার ও নানা ধরনের কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশ অংশে আটকা পড়ে আছে। এই বিপুল সংখ্যক বন্য হাতির আকস্মিক ও স্থায়ী আটকা পড়ার ঘটনা কেবল স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি এখন দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক নতুন কূটনৈতিক ও পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বন্য হাতির এই নিয়মিত বিচরণ পথ বা করিডোর সচল থাকলেও, সম্প্রতি সীমান্তে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এই প্রাকৃতিক অভিবাসন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় অঞ্চলে স্থানীয় জনসাধারণ ও হাতিগুলোর মধ্যে এক চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে, যার স্থায়ী সমাধান এখনও মেলেনি।
বন্য হাতিগুলোর এই আটকে পড়ার নেপথ্যে রয়েছে মূলত দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের হাতি চলাচলের ট্রানজিট রুট বা করিডোরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া। অতীতে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে বন্য হাতির দল নিয়মিত বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে আসত এবং খাদ্য সংগ্রহ করে আবার ফিরে যেত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় সীমান্তে বর্ডার ফেন্সিং বা কাঁটাতারের বেড়া এবং শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ফেন্সিং স্থাপনের কারণে হাতিগুলোর স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি সাধারণত তাদের দীর্ঘদিনের মেমোরি বা জন্মসূত্রে পাওয়া পথ ধরেই চলাচল করে, যা হঠাৎ কৃত্রিম উপায়ে রোধ করায় তারা মারাত্মক দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে এবং হাতিগুলোকে নিরাপদে তাদের নিজেদের আবাসে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান সমাধান পাওয়া যায়নি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা এই সংকট নিরসনে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাতিগুলোকে জোরপূর্বক তাড়ানোর চেষ্টা করা হলে তা আরও বড় ধরনের মানব-হাতি সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে, ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্ত নিরাপত্তার অজুহাতে বেড়া অপসারণ বা হাতি পারাপারের জন্য নির্দিষ্ট গেট খোলার বিষয়ে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রটোকল এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন না হওয়ায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা চরম হোঁচট খাচ্ছে। বন্যপ্রাণী গবেষক ও অধিকারকর্মীরা বারবার তাগিদ দিয়ে আসছেন যে, হাতি একটি পরিযায়ী প্রজাতি এবং এদের সুরক্ষায় দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া কোনো টেকসই সমাধান সম্ভব নয়, অথচ কূটনৈতিক পত্রালাপের বাইরে কার্যকর কোনো যৌথ টাস্কফোর্স এখনও গঠিত হয়নি।
এই দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার কারণে শেরপুর সীমান্তের স্থানীয় জনপদে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং এক প্রকার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। দিনের বেলা হাতিগুলো পাহাড়ি বনাঞ্চলে বা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকলেও সন্ধ্যার নামার সাথে সাথেই লোকালয়ে নেমে এসে আমবাগান, ধানক্ষেত ও বসতবাড়ির ওপর চড়াও হচ্ছে। ইতোমধ্যে শত শত কৃষকের কষ্টের ফসল, ঘরবাড়ি এবং কাঁচা ঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বহু প্রান্তিক চাষী। স্থানীয় গ্রামবাসীরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রাত কাটাচ্ছেন এবং অনেক স্থানে জীবনের সুরক্ষায় পাহারা বসাতে বাধ্য হয়েছেন। খাদ্য সংকটের কারণে এই বিশাল আকৃতির বন্য হাতিগুলো কেবল ফসলের ক্ষতিই করছে না, বরং মানুষের জীবনের ওপর সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে এবং মশাল জ্বালিয়ে হাতিগুলোকে লোকালয় থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে, শেরপুর সীমান্তে আটকা পড়া ১৩০টিরও বেশি বন্য হাতির এই সংকট কেবল একটি স্থানীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি আন্তঃসীমান্ত জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কূটনৈতিক সদিচ্ছার এক বড় পরীক্ষা। ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট এড়াতে হলে বাংলাদেশ ও ভারতকে অবিলম্বে যৌথভাবে এলিফ্যান্ট করিডোরগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সীমান্ত বেড়ায় এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে বন্যপ্রাণী নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। একই সাথে, হাতিগুলোর খাদ্যের জোগান ও সুরক্ষার জন্য গারো পাহাড় অঞ্চলের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনসাধারণকে যথাযথ সরকারি প্রণোদনা বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কূটনৈতিক আলোচনা কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরণের মানব ও প্রাণীকুলের ট্র্যাজেডি ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জ সংবাদ | Dainik Sunamganj Sangbad. ফোনঃ +8801738462523 ইমেইলঃ sunamganjsangbad@gmail.com
©২০২৬ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | Presented by ITFaire