প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন অর্থনীতি: সংকটের মেঘ নাকি নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত
- আপডেট সময়ঃ ০৬:২১:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / ৬ বার পড়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবার লাগামহীন ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের চাপে সাধারণ আমেরিকানরা যখন গভীর ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন, ঠিক তখনই হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনভার শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা কী এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতিগুলো কীভাবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়া এবং অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখা—উভয় সংকটেই পড়তে হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশটিকে। ভোটারদের প্রত্যাশা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সূচকগুলোর মধ্যে এক ধরনের দৃশ্যমান ফারাক লক্ষ করা যাচ্ছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতি যখন নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন মার্কিন অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে নতুন নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
এই অর্থনৈতিক সংকটের পেছনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক বছর ধরে চলা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আজ মার্কিন অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। করোনাকালীন সময়ে প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রার সরবরাহ ঘটায় পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ভেঙেছিল, যা আজও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। সাবেক বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছরগুলোতে যদিও কর্মসংস্থানের হার কিছুটা সন্তোষজনক ছিল, তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় মজুরি সেভাবে বাড়েনি। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের সঞ্চয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এদিকে, জ্বালানি তেলের বাজারমূল্যের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চলা শুল্কযুদ্ধ অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। দায়িত্বশীল মহল ও ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারকরা বারবার সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালালেও, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আবাসন খাত এবং সাধারণ ব্যবসায়িক ঋণের ওপর।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় মার্কিন অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার নানা উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কর কমানো, অপ্রয়োজনীয় বিধিমালা বা রেগুলেশন বাতিল করা এবং আমদানির ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করা। ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক দায়িত্বশীলরা যুক্তি দেখিয়ে আসছেন যে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে এবং ফসিজ জ্বালানির ব্যবহার সহজলভ্য করার মাধ্যমেই কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা মনে করছেন, করপোরেট কর হ্রাস করলে দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট সমর্থক অর্থনীতিবিদ এবং স্বাধীন বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, উচ্চ শুল্ক নীতির কারণে উল্টো আমদানি খরচ বেড়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হবে। ফেড চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতিপ্রণেতারা মুদ্রাস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসে পড়ছে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর। মুদির দোকান থেকে শুরু করে পেট্রল পাম্প—সবখানেই প্রতিটি পণ্যের বর্ধিত মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে আবাসন খাতের চড়া মূল্য এবং বন্ধকী ঋণের (মর্টগেজ) উচ্চ সুদের হারের কারণে নতুন বাড়ি কেনা তো দূরের কথা, সাধারণ ভাড়া পরিশোধ করাও অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটারদের এই অর্থনৈতিক অসন্তোষই মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর মূল উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটাররা পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছেন যে, বড় বড় অর্থনৈতিক সূচক বা শেয়ার বাজারের ঊর্ধ্বগতি তাদের দৈনন্দিন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না; বরং তাদের প্রধান দাবি হলো বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ ও হতাশা আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনেও বড় ভূমিকা রাখছে।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা যায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভর করবে প্রশাসনের গৃহীত নীতিমালার বাস্তবসম্মত প্রয়োগ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির ওপর। একদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ার দীর্ঘমেয়াদী সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতের করণীয় হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনকে কেবল কর কমানো বা শুল্ক আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারের ঘাটতি দূর করার দিকেও গভীর মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভের সঙ্গে কাজের সুসমন্বয় বজায় রেখে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যদি বর্তমান প্রশাসন সফলভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, তবেই ট্রাম্পের অর্থনৈতিক মডেল সফল হিসেবে পরিগণিত হবে। নতুবা এই অর্থনৈতিক অসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।









