০৮:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

দ্বীনি শিক্ষার আড়ালে নৈতিক অবক্ষয়: কওমি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতন রোধে কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কঠোর জবাবদিহিতা?

রিপোর্টার নামঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৪:০২:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • / ২৫ বার পড়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে কওমি মাদ্রাসাগুলো দীর্ঘকাল ধরে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিকতা চর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের ভেতরে কোমলমতি শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের একের পর এক ভয়াবহ চিত্র জনমনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের শিক্ষার জায়গায় যেখানে শিশুদের নৈতিক চরিত্র গঠনের কথা, সেখানে কতিপয় শিক্ষক নামধারী অপরাধীর হাতে শিশুদের শৈশব কলঙ্কিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারির একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, কোনো প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেটি রাষ্ট্রীয় আইন, সুশাসন বা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া উচিত। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমাজের একটি বড় অংশের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দাবি প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যা কওমি মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

কওমি মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর চলমান এই পাশবিকতার পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে এক অন্ধকার বাস্তবতা ফুটে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরণের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা বা অতীত অপরাধমূলক রেকর্ড যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলো আবাসিক হওয়ায় শিশুরা সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কওমি মাদ্রাসাগুলোর একটি বিশাল অংশ মূলধারার সরকারি নজরদারির বাইরে থাকায় সেখানে এক ধরণের বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ঘটনার শিকার শিশুরা অনেক সময় লজ্জায় বা ভয়ে মুখ খুলতে পারে না, আর যদি কেউ সাহস করে জানায়ও, তবে প্রতিষ্ঠানের ‘সম্মান রক্ষার্থে’ বা ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আল্লামা আজহারির ভাষায়, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় অপরাধীকে আড়াল করা নয়, বরং তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করাই প্রকৃত ধার্মিকতার পরিচয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, অনেক সময় প্রভাবশালী মহল বা পরিচালনা পর্ষদ অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে অথবা লঘু শাস্তির মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট করে ফেলে, যা পুনরায় এমন অপরাধ করতে অন্যদের উৎসাহিত করে।

এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো মাদ্রাসা বোর্ডগুলোর শৈথিল্য ও যথাযথ তদারকির অভাব। বেফাকসহ বিভিন্ন কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নীতিমালার কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনেকেই এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলতে কুন্ঠাবোধ করেন, যা অপরাধীদের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করে। ইসলামি আইন বা শরিয়তের দোহাই দিয়ে অনেকে মনে করেন যে, মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ অনাকাঙ্ক্ষিত। অথচ মিজানুর রহমান আজহারি তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ইসলাম কখনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না। দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এবং সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করা ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। যখন একজন শিক্ষক তার পবিত্র আমানত হিসেবে রক্ষিত ছাত্রের ওপর পাশবিক আচরণ করে, তখন সে কেবল অপরাধীই নয়, বরং পুরো দ্বীনি শিক্ষার ঐতিহ্যের জন্য এক কলঙ্ক। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এই সত্যটি মেনে নিতে হবে যে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব।

বর্তমান সময়ে এই ঘটনার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে পড়ছে। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা, যারা তাদের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার জন্য মাদ্রাসায় পাঠান, তারা এখন এক ধরণের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্যাতনের সংবাদগুলো তাদের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, মাদ্রাসাগুলো বুঝি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে, যা ইসলামের ভাবমূর্তিকে বহির্বিশ্বে এবং দেশের অভ্যন্তরে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠছেন এবং মাদ্রাসাগুলোকে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার দাবি তুলছেন। এই গণঅসন্তোষ প্রমাণ করে যে, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষও এখন আর ধর্মীয় দোহাই দিয়ে অপরাধ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আরও ভয়াবহ; যারা এই নির্যাতনের শিকার হয়, তারা সারা জীবন এক ধরণের ট্রমা ও হীনম্মন্যতায় ভোগে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

ভবিষ্যতে এই পাশবিকতা রোধে মাদ্রাসাগুলোতে আমূল সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, প্রতিটি মাদ্রাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিতভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সারপ্রাইজ ভিজিটের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে এবং প্রতিটি শিক্ষকের জন্য নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। আল্লামা আজহারির প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করতে হবে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়মিত যাচাই করা হবে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন সচেতনতা এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে যাতে তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে। মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সচেতন অভিভাবকদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যাতে কোনো অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব না হয়। সর্বোপরি, রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে যাতে ধর্মীয় শিক্ষার লেবাসে কেউ শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধীকে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই ধরণের ন্যক্কারজনক ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

দ্বীনি শিক্ষার আড়ালে নৈতিক অবক্ষয়: কওমি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতন রোধে কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কঠোর জবাবদিহিতা?

আপডেট সময়ঃ ০৪:০২:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে কওমি মাদ্রাসাগুলো দীর্ঘকাল ধরে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিকতা চর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের ভেতরে কোমলমতি শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের একের পর এক ভয়াবহ চিত্র জনমনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের শিক্ষার জায়গায় যেখানে শিশুদের নৈতিক চরিত্র গঠনের কথা, সেখানে কতিপয় শিক্ষক নামধারী অপরাধীর হাতে শিশুদের শৈশব কলঙ্কিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারির একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, কোনো প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেটি রাষ্ট্রীয় আইন, সুশাসন বা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া উচিত। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমাজের একটি বড় অংশের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দাবি প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যা কওমি মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

কওমি মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর চলমান এই পাশবিকতার পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে এক অন্ধকার বাস্তবতা ফুটে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরণের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা বা অতীত অপরাধমূলক রেকর্ড যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলো আবাসিক হওয়ায় শিশুরা সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কওমি মাদ্রাসাগুলোর একটি বিশাল অংশ মূলধারার সরকারি নজরদারির বাইরে থাকায় সেখানে এক ধরণের বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ঘটনার শিকার শিশুরা অনেক সময় লজ্জায় বা ভয়ে মুখ খুলতে পারে না, আর যদি কেউ সাহস করে জানায়ও, তবে প্রতিষ্ঠানের ‘সম্মান রক্ষার্থে’ বা ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আল্লামা আজহারির ভাষায়, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় অপরাধীকে আড়াল করা নয়, বরং তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করাই প্রকৃত ধার্মিকতার পরিচয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, অনেক সময় প্রভাবশালী মহল বা পরিচালনা পর্ষদ অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে অথবা লঘু শাস্তির মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট করে ফেলে, যা পুনরায় এমন অপরাধ করতে অন্যদের উৎসাহিত করে।

এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো মাদ্রাসা বোর্ডগুলোর শৈথিল্য ও যথাযথ তদারকির অভাব। বেফাকসহ বিভিন্ন কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নীতিমালার কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনেকেই এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলতে কুন্ঠাবোধ করেন, যা অপরাধীদের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করে। ইসলামি আইন বা শরিয়তের দোহাই দিয়ে অনেকে মনে করেন যে, মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ অনাকাঙ্ক্ষিত। অথচ মিজানুর রহমান আজহারি তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ইসলাম কখনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না। দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এবং সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করা ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। যখন একজন শিক্ষক তার পবিত্র আমানত হিসেবে রক্ষিত ছাত্রের ওপর পাশবিক আচরণ করে, তখন সে কেবল অপরাধীই নয়, বরং পুরো দ্বীনি শিক্ষার ঐতিহ্যের জন্য এক কলঙ্ক। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এই সত্যটি মেনে নিতে হবে যে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব।

বর্তমান সময়ে এই ঘটনার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে পড়ছে। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা, যারা তাদের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার জন্য মাদ্রাসায় পাঠান, তারা এখন এক ধরণের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্যাতনের সংবাদগুলো তাদের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, মাদ্রাসাগুলো বুঝি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে, যা ইসলামের ভাবমূর্তিকে বহির্বিশ্বে এবং দেশের অভ্যন্তরে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠছেন এবং মাদ্রাসাগুলোকে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার দাবি তুলছেন। এই গণঅসন্তোষ প্রমাণ করে যে, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষও এখন আর ধর্মীয় দোহাই দিয়ে অপরাধ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আরও ভয়াবহ; যারা এই নির্যাতনের শিকার হয়, তারা সারা জীবন এক ধরণের ট্রমা ও হীনম্মন্যতায় ভোগে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

ভবিষ্যতে এই পাশবিকতা রোধে মাদ্রাসাগুলোতে আমূল সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, প্রতিটি মাদ্রাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিতভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সারপ্রাইজ ভিজিটের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে এবং প্রতিটি শিক্ষকের জন্য নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। আল্লামা আজহারির প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করতে হবে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়মিত যাচাই করা হবে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন সচেতনতা এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে যাতে তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে। মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সচেতন অভিভাবকদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যাতে কোনো অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব না হয়। সর্বোপরি, রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে যাতে ধর্মীয় শিক্ষার লেবাসে কেউ শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধীকে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই ধরণের ন্যক্কারজনক ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।