ওয়াশিংটনে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ: কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকলেও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের সাথে সংঘাত ও সীমাবদ্ধতা কতটুকু?
- আপডেট সময়ঃ ১১:০২:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ২২ বার পড়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর আইনসভার নিয়ন্ত্রণ বা কংগ্রেস এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকলেও হোয়াইট হাউস তথা নির্বাহী বিভাগের চাবিকাঠি রয়ে গেছে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের কাছে। এই বিভক্ত সরকার ব্যবস্থার ফলে মার্কিন রাজনীতিতে এক জটিল সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা চাইলেই এখন তাদের পছন্দমতো সব আইন পাস করতে পারবে না, কারণ মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যেকোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে তাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টও তার একক ইচ্ছায় বড় কোনো নীতি পরিবর্তন বা বাজেট বরাদ্দ করতে পারবেন না, কারণ অর্থের জোগান বা ‘পাওয়ার অব দ্য পার্স’ এখন ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের হাতে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটনে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে এক চরম অচলাবস্থা বা ‘গ্রিডলক’ তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকার ফলে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হবে তদন্ত করার ক্ষমতা। মার্কিন সংবিধানের আওতায় কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি এখন প্রেসিডেন্টের প্রশাসন, তার ব্যবসায়িক লেনদেন এবং নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে পারবে। তারা প্রয়োজনে যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে তলব করতে পারবে এবং হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র জনসমক্ষে আনার ক্ষমতা রাখবে। এই তদারকি ক্ষমতা রিপাবলিকান প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটরা যদি মনে করে যে প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন, তবে তারা তদন্তের মাধ্যমে জনমত গঠন করতে পারবে। তবে এই ক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা আছে; তদন্তের পর কোনো ব্যবস্থার জন্য অনেক ক্ষেত্রে আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে। তারা যদি জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো বিল প্রতিনিধি সভা বা সিনেটে পাসও করে, প্রেসিডেন্ট তার ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তা আটকে দিতে পারেন। সেই ভেটো বাতিল করে বিলটিকে আইনে রূপান্তর করতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের জন্য জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। তাই ডেমোক্র্যাটরা চাইলেই তাদের ইশতেহারে থাকা বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলো সরাসরি কার্যকর করতে পারবে না। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের সাথে আপস-মীমাংসা ছাড়া বড় কোনো জাতীয় নীতি গ্রহণ করা তাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বাজেট ও অর্থায়নের বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের হাতে এক বিশাল ক্ষমতা অর্পণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সরকারি যেকোনো ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা কংগ্রেসের। এর ফলে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট যদি কোনো বিতর্কিত প্রকল্পে যেমন—সীমান্ত দেয়াল নির্মাণ বা কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযানে অতিরিক্ত অর্থ চান, ডেমোক্র্যাটরা তা সহজেই আটকে দিতে পারবে। অন্যদিকে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বা জনহিতকর প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল অনুমোদনের সময় ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের দাবি দাওয়া আদায় করে নিতে প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করতে পারবে। এই ‘শাটডাউন’ বা সরকারি কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা দর কষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে, যা মার্কিন রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়।
পররাষ্ট্র নীতি এবং বিচারবিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যদিও পররাষ্ট্র নীতি মূলত প্রেসিডেন্টের এখতিয়ার, কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক সাহায্যের জন্য অর্থের অনুমোদন নিতে তাকে কংগ্রেসের দ্বারস্থ হতেই হবে। এছাড়া, যদি ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে সিনেট থাকে, তবে প্রেসিডেন্ট তার পছন্দমতো ফেডারেল বিচারক বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়বেন। ডেমোক্র্যাটরা চাইলে যোগ্যতার প্রশ্ন তুলে রিপাবলিকান মনোনীত প্রার্থীদের আটকে দিতে পারে, যা প্রেসিডেন্টের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক এজেন্ডাকে ব্যাহত করবে। তবে সরাসরি নির্বাহী আদেশ বা ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের যে ক্ষমতা আছে, তাতে কংগ্রেসের খুব একটা নিয়ন্ত্রণ নেই, যা ডেমোক্র্যাটদের জন্য এক বড় সীমাবদ্ধতা।
পরিশেষে বলা যায়, ওয়াশিংটনের এই ক্ষমতার বিভাজন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থার একটি প্রতিফলন। ডেমোক্র্যাটরা এখন আইনসভার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে এবং প্রশাসনের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তগুলোকে রুখে দিতে পারবে। কিন্তু তারা একা দেশ পরিচালনার মতো অবস্থানে নেই। বর্তমান এই কাঠামোয় কোনো বড় পরিবর্তন আনতে হলে দুই পক্ষকেই দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। অন্যথায়, রাজনৈতিক সংঘাত ও আইনি লড়াইয়ের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সাধারণ জনগণের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য থমকে যেতে পারে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।



















