মহাপ্রলয়ের আতঙ্ক নাকি নিছক ভুল ব্যাখ্যা: ১৯৬০ সালের সেই গবেষণা এবং বর্তমানের গুজব
- আপডেট সময়ঃ ০২:০১:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে।

গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, আগামী ১৩ই নভেম্বর পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। এই গুঞ্জনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৬০ সালের ৪ঠা নভেম্বর স্বনামধন্য মার্কিন বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ। নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল-“ডুমসডে: ফ্রাইডে, নভেম্বর ১৩” বা “মহাপ্রলয়: ১৩ই নভেম্বর, শুক্রবার”। এই শিরোনামটিকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, যা মূলত আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভুল ব্যাখ্যার একটি ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
সায়েন্স সাময়িকীর ওই ঐতিহাসিক গবেষণাপত্রটি মূলত কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানগত প্রলয় বা কেয়ামতের পূর্বাভাস ছিল না। এটি ছিল মূলত পপুলেশন ডেমোগ্রাফি বা জনমিতি এবং মানব জনসংখ্যার অতিরিক্ত বৃদ্ধির প্রবৃদ্ধির হারের ওপর একটি গাণিতিক মডেল ও দার্শনিক ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন। ওই সময়কার তিন গবেষক—হেইনজ ফন ফোরস্টার, প্যাট্রিস মায়ার এবং উইলিয়াম আমন—গণিত ও পরিসংখ্যানের সাহায্যে দেখাতে চেয়েছিলেম যে, মানব জনসংখ্যা যেভাবে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা একসময় খাদ্য উৎপাদন ও পৃথিবীর ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে। গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে তারা প্রতীকীভাবে হিসাব করে দেখিয়েছিলেন যে, ওই বৃদ্ধির হার চলতে থাকলে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর মানবজাতি এক চরম সংকটের মুখে পড়বে। কিন্তু নিবন্ধটির প্রচ্ছদ ও শিরোনামের নাটকীয়তার কারণে সাধারণ মানুষ একে পৃথিবীর ভৌত ধ্বংস বা মহাপ্রলয় হিসেবে ভুল বুঝেছে।
মূলত, বিজ্ঞান লেখালিখিতে রূপক বা ব্যঙ্গাত্মক শিরোনাম ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেকালের গবেষকরা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ‘ডুমসডে’ বা মহাপ্রলয় শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল নীতিনির্ধারকদের অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা সম্পর্কে সতর্ক করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অর্ধশতাব্দী পার হয়ে বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে এসে সেই প্রতীকী গবেষণাটিকেই আক্ষরিক সত্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূল সুর এবং এর পেছনের গাণিতিক যুক্তিগুলো এড়িয়ে গিয়ে কেবল তারিখ ও ‘ডুমসডে’ শব্দটিকে পুঁজি করে তৈরি করা হচ্ছে মনগড়া তত্ত্ব, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতিরই একটি অংশ।
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এই ধরনের যেকোনো দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন। নাসাসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, পৃথিবীর ধ্বংস বা কোনো মহাপ্রলয় ঘটার মতো কোনো গ্রহাণু বা মহাজাগতিক হুমকি এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়। বিজ্ঞানীরা বারবার উল্লেখ করেছেন যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করে বা এর প্রেক্ষাপট না বুঝে প্রচার করা হলে তা সমাজে অপ্রয়োজনীয় ভীতি সৃষ্টি করে। ১৯৬০ সালের সেই নিবন্ধে জনসংখ্যার যে গাণিতিক মডেল দেওয়া হয়েছিল, তার সাথে বর্তমান বাস্তবতার অনেক অমিল রয়েছে, কারণ গত কয়েক দশকে মানুষের জন্মহার এবং সচেতনতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘১৩ই নভেম্বর পৃথিবীর ধ্বংস’—এই প্রচারণার পেছনে কোনো বাস্তব বা বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই। এটি কেবল মানুষের অজানার প্রতি ভয় এবং সংবেদনশীল শিরোনাম লুফে নেওয়ার প্রবণতার একটি ফল মাত্র। বর্তমান যুগে তথ্যের ছড়াছড়ির মাঝে কোনটি সত্য এবং কোনটি গুজব, তা যাচাই করার দায়িত্ব সচেতন নাগরিকদেরই। এ ধরণের ভিত্তিহীন গুজবে কান না দিয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়াই সময়ের দাবি, যাতে কোনো আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি সমাজকে স্থবির করে তুলতে না পারে।



















