সুন্দরবনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুরা: জিম্মি জীবন ও চরম উৎকণ্ঠায় উপকূলের জেলেরা
- আপডেট সময়ঃ ০৩:০১:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- / ২০ বার পড়া হয়েছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ফুসফুস এবং জীবিকার প্রধান উৎস সুন্দরবনের ভেতরে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দীর্ঘকাল ধরে দমন হওয়া বনদস্যুদের তৎপরতা। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই মূলত এই অপরাধী চক্রগুলো নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জেলে, বাওয়ালি এবং মৌয়ালদের একটি বড় অংশ এখন চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযানের ফলে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হওয়ার পথে থাকলেও, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা আবারও তাদের পুরনো রাজত্ব কায়েম করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দস্যুদের নতুন এই দৌরাত্ম্যের শিকার হয়ে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম হয়েছে সাধারণ পেশাজীবীদের। সম্প্রতি মুক্তিপণ এবং চাঁদার এক অবিশ্বাস্য চিত্র উঠে এসেছে জেলেদের মুখে। মুক্তিপণ বা চাঁদার দাবিতে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো হচ্ছে অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জেলে আতঙ্কিত কণ্ঠে জানিয়েছেন, দস্যুদের নির্মমতার মাত্রা এতটাই ছাড়িয়ে গেছে যে, প্রাণ বাঁচাতে তাদেরকে ধারদেনা করে লাখ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এক জেলের ভাষ্যমতে, দস্যুদের দাবি মেটাতে গিয়ে তাকে ১০ টাকার একটি সাধারণ নোটের বিনিময়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
অথচ বিগত বছরগুলোতে র্যাব, পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযানের মুখে সুন্দরবনের ত্রাস হিসেবে পরিচিত শীর্ষ দস্যু বাহিনীগুলো অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ বেছে নিয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো তৎপরতার কারণে সুন্দরবনে স্বস্তি ফিরে এসেছিল এবং জেলেরা নির্বিঘ্নে তাদের পেশাগত কাজ পরিচালনা করতে পারতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক নজরদারির কিছুটা শিথিলতা এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিংয়ের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে সেই আত্মসমর্পণকারী কিংবা নতুন গড়ে ওঠা আন্ডারগ্রাউন্ড অপরাধী চক্রগুলো বনের গভীরে তাদের আস্তানা গাড়ছে এবং চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য তৈরি করছে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার পাশাপাশি এখানকার অর্থনীতি সরাসরি জড়িত বনের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষের সাথে। বনদস্যুদের এই অবাধ বিচরণ কেবল মানুষের জানমালের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত করছে না, বরং তা সামগ্রিক মৎস্য ও বনজ সম্পদ আহরণ খাতকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। জেলেরা নদীতে জাল ফেলার আগেই দস্যুদের চাঁদা পরিশোধের চিরকুট বা মোবাইল নম্বর পৌঁছে যাচ্ছে তাদের কাছে। নির্দিষ্ট অংকের টাকা না দিলে অপহরণ করে নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের এই চক্রের কারণে সুন্দরবনের চারপাশের গ্রামগুলোতে এখন শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারগুলো তাদের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে প্রতিদিন বক্সে পাঠিয়ে সারাদিন চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটায়।
পরিস্থিতি যে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা উপকূলীয় অঞ্চলের সচেতন মহল ও স্থানীয় প্রশাসনও উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে সুন্দরবনে অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর কঠোর এবং স্থায়ী অভিযান পরিচালনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযান নয়, বরং বনের অভ্যন্তরে দস্যুদের যাতায়াতের গোপন রুটগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, একসময়ের এই দস্যুমুক্ত সুন্দরবন আবারও অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতি এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত।



















