০৯:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

বন্দিদশা থেকে ক্ষমতার শীর্ষে: ৭ নভেম্বরের সেই নাটকীয় রাত ও জিয়ার উত্থান

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময়ঃ ০৩:০১:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৩ বার পড়া হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বরের সন্ধ্যাটি ছিল ঢাকা সেনানিবাসের ইতিহাসে অন্যতম রহস্যময় ও থমথমে এক প্রহর। রাজধানী ঢাকা তখন এক অবরুদ্ধ, অনিশ্চিত এবং গুজবের নগরী। সেনানিবাসের অন্দরে বাতাসে ভাসছিল এক তীব্র চাপা উত্তেজনা, যা সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্নায়ুকে চরমভাবে আলোড়িত করছিল। সন্ধ্যার আবছা আলোয় দ্রুত হাতবদল হতে শুরু করে বেশ কিছু গোপন লিফলেট। সেই লিফলেটের ক্ষুরধার বক্তব্য যারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তারা স্পষ্টতই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে মধ্যরাতে এমন ‘কিছু একটা’ ঘটতে যাচ্ছে, যা পুরো দেশের ক্ষমতার সমীকরণকে ওলটপালট করে দেবে। সৈনিকদের অসন্তোষ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন বাংলাদেশ।

এর ঠিক তিন দিন আগে, অর্থাৎ ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর থেকে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজ বাসভবনে কার্যত গৃহবন্দী ছিলেন। সেনাবাহিনীতে স্বাভাবিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছিল এবং একাধিক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শক্তির দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। জিয়াকে নিষ্ক্রিয় করে ক্ষমতার যে নতুন বলয় তৈরির চেষ্টা চলছিল, তা সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিশেষত জাসদ সমর্থিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পুরো সেনানিবাসে তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে তোলে। গৃহবন্দী জিয়া তখন শুধু একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত জেনারেল ছিলেন না, বরং সিপাহিদের একটি বড় অংশের কাছে শৃঙ্খলা ও জাতীয়তাবাদী অনুভূতির প্রতীক হয়ে উঠছিলেন।

৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে শুরু হয় সেই বহুপ্রতীক্ষিত ও নাটকীয় পটপরিবর্তন। সেনানিবাসের নীরবতা চূর্ণ করে আকাশে গর্জে ওঠে ট্যাঙ্কের গর্জন আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মুহুর্মুহু গুলি। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সেনানিবাস থেকে রাজপথ। কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের অনুসারী সৈনিকরা কোনো রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ ছাড়াই জিয়ার বাসভবনে উপস্থিত হন এবং তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। সেই নাটকীয় মুহূর্তে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে এক ঝটকায় সেনা সদস্যদের কাঁধে চড়ে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে আসেন জিয়াউর রহমান। এই মুক্তিতে তিনি কেবল ব্যক্তিগত স্বাধীনতাই ফিরে পাননি, বরং ক্ষুব্ধ ও দিশেহারা সেনাবাহিনীর একক অভিভাবক ও আস্থাভাজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

তবে মুক্তির পরপরই জিয়ার সামনে দাঁড়িয়েছিল এক জটিল ও বিপজ্জনক রাজনৈতিক খেলা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দাবিদাওয়া ও কর্নেল তাহেরের বামপন্থী রাজনৈতিক অভীষ্টের বিপরীতে জিয়া অত্যন্ত চতুর, বাস্তববাদী ও দৃঢ় কৌশলের আশ্রয় নেন। সিপাহিদের ক্ষণস্থায়ী আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে সামরিক শৃঙ্খলার ছকে ফিরিয়ে আনতে তিনি একটুও দ্বিধা করেননি। অতি দ্রুত তিনি পুরো পরিস্থিতির রাশ নিজের শক্ত হাতে তুলে নেন এবং ভোররাতে রেডিও স্টেশনে গিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই সংকটময় মুহূর্তে জিয়ার প্রজ্ঞা, ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত এবং সামরিক ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতাই তাকে অন্যদের চেয়ে ক্ষমতার দৌড়ে চূড়ান্তভাবে এগিয়ে দেয়।

৭ নভেম্বরের সেই ঘটনাবহুল রাতের মধ্য দিয়েই কার্যত রচিত হয় বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘস্থায়ী রূপরেখা। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জিয়ার এই নাটকীয় অভিষেক শুধু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মেরুকরণের অবসান ঘটায়নি, বরং পরবর্তী সময়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন ধারার পথ উন্মুক্ত করে। একজন গৃহবন্দী সেনাপ্রধান থেকে পরাক্রমশালী রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় বাঁক। ৬ নভেম্বরের সেই লিফলেট বিতরণ ও চাপা উত্তেজনার রাতটি তাই নিছক কোনো সেনাবিদ্রোহের সূচনা ছিল না, বরং তা ছিল দেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

বন্দিদশা থেকে ক্ষমতার শীর্ষে: ৭ নভেম্বরের সেই নাটকীয় রাত ও জিয়ার উত্থান

আপডেট সময়ঃ ০৩:০১:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বরের সন্ধ্যাটি ছিল ঢাকা সেনানিবাসের ইতিহাসে অন্যতম রহস্যময় ও থমথমে এক প্রহর। রাজধানী ঢাকা তখন এক অবরুদ্ধ, অনিশ্চিত এবং গুজবের নগরী। সেনানিবাসের অন্দরে বাতাসে ভাসছিল এক তীব্র চাপা উত্তেজনা, যা সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্নায়ুকে চরমভাবে আলোড়িত করছিল। সন্ধ্যার আবছা আলোয় দ্রুত হাতবদল হতে শুরু করে বেশ কিছু গোপন লিফলেট। সেই লিফলেটের ক্ষুরধার বক্তব্য যারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তারা স্পষ্টতই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে মধ্যরাতে এমন ‘কিছু একটা’ ঘটতে যাচ্ছে, যা পুরো দেশের ক্ষমতার সমীকরণকে ওলটপালট করে দেবে। সৈনিকদের অসন্তোষ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন বাংলাদেশ।

এর ঠিক তিন দিন আগে, অর্থাৎ ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর থেকে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজ বাসভবনে কার্যত গৃহবন্দী ছিলেন। সেনাবাহিনীতে স্বাভাবিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছিল এবং একাধিক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শক্তির দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। জিয়াকে নিষ্ক্রিয় করে ক্ষমতার যে নতুন বলয় তৈরির চেষ্টা চলছিল, তা সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিশেষত জাসদ সমর্থিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পুরো সেনানিবাসে তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে তোলে। গৃহবন্দী জিয়া তখন শুধু একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত জেনারেল ছিলেন না, বরং সিপাহিদের একটি বড় অংশের কাছে শৃঙ্খলা ও জাতীয়তাবাদী অনুভূতির প্রতীক হয়ে উঠছিলেন।

৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে শুরু হয় সেই বহুপ্রতীক্ষিত ও নাটকীয় পটপরিবর্তন। সেনানিবাসের নীরবতা চূর্ণ করে আকাশে গর্জে ওঠে ট্যাঙ্কের গর্জন আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মুহুর্মুহু গুলি। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সেনানিবাস থেকে রাজপথ। কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের অনুসারী সৈনিকরা কোনো রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ ছাড়াই জিয়ার বাসভবনে উপস্থিত হন এবং তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। সেই নাটকীয় মুহূর্তে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে এক ঝটকায় সেনা সদস্যদের কাঁধে চড়ে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে আসেন জিয়াউর রহমান। এই মুক্তিতে তিনি কেবল ব্যক্তিগত স্বাধীনতাই ফিরে পাননি, বরং ক্ষুব্ধ ও দিশেহারা সেনাবাহিনীর একক অভিভাবক ও আস্থাভাজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

তবে মুক্তির পরপরই জিয়ার সামনে দাঁড়িয়েছিল এক জটিল ও বিপজ্জনক রাজনৈতিক খেলা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দাবিদাওয়া ও কর্নেল তাহেরের বামপন্থী রাজনৈতিক অভীষ্টের বিপরীতে জিয়া অত্যন্ত চতুর, বাস্তববাদী ও দৃঢ় কৌশলের আশ্রয় নেন। সিপাহিদের ক্ষণস্থায়ী আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে সামরিক শৃঙ্খলার ছকে ফিরিয়ে আনতে তিনি একটুও দ্বিধা করেননি। অতি দ্রুত তিনি পুরো পরিস্থিতির রাশ নিজের শক্ত হাতে তুলে নেন এবং ভোররাতে রেডিও স্টেশনে গিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই সংকটময় মুহূর্তে জিয়ার প্রজ্ঞা, ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত এবং সামরিক ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতাই তাকে অন্যদের চেয়ে ক্ষমতার দৌড়ে চূড়ান্তভাবে এগিয়ে দেয়।

৭ নভেম্বরের সেই ঘটনাবহুল রাতের মধ্য দিয়েই কার্যত রচিত হয় বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘস্থায়ী রূপরেখা। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জিয়ার এই নাটকীয় অভিষেক শুধু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মেরুকরণের অবসান ঘটায়নি, বরং পরবর্তী সময়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন ধারার পথ উন্মুক্ত করে। একজন গৃহবন্দী সেনাপ্রধান থেকে পরাক্রমশালী রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় বাঁক। ৬ নভেম্বরের সেই লিফলেট বিতরণ ও চাপা উত্তেজনার রাতটি তাই নিছক কোনো সেনাবিদ্রোহের সূচনা ছিল না, বরং তা ছিল দেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।