শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল: জাপানের শর্তে কি দেশি স্বার্থের সুরক্ষা বিঘ্নিত?
- আপডেট সময়ঃ ০১:০২:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৬ বার পড়া হয়েছে।


হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল বর্তমানে দেশের এভিয়েশন খাতের সর্ববৃহৎ ও আধুনিকতম অবকাঠামো। এই স্বপ্নের প্রকল্পের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতার এক নতুন দিগন্ত উম্মোচন করতে যাচ্ছে। তবে এই টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জাপানের চারটি বৃহৎ কোম্পানির একটি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হতেই জনমনে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের দানা বাঁধছে। বিশেষ করে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেলের আওতায় সম্পাদিতব্য এই চুক্তির শর্তগুলো ঠিক কতটা দেশের অনুকূলে থাকবে, তা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। কারণ, বিমানবন্দর কেবল একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের প্রবেশপথ এবং জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাথে চুক্তির অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও শর্তাবলি। সাধারণত এ ধরণের বড় অবকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ধরণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়, জাপানি পক্ষ থেকে তার চেয়েও কঠোর কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টার্মিনালের অভ্যন্তরীণ আয় ও রাজস্ব বণ্টনের বিষয়টি। ধারণা করা হচ্ছে, আয়ের একটি বড় অংশ বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সিভিল এভিয়েশন অথরিটির আর্থিক সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এছাড়া, অপারেশনাল খরচের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হতে পারে, অথচ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোতে বিদেশি কনসোর্টিয়ামের আধিপত্য থাকবে নিরঙ্কুশ। এই ধরণের অসম চুক্তির ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে শেষ পর্যন্ত কতটুকু অর্থ জমা হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
বিমানবন্দর পরিচালনার সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজগুলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স করে আসলেও তাদের সেবার মান নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তবে জাপানি কোম্পানিকে এই দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে যে শর্ত দেওয়া হচ্ছে, তা বিমানের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। জাপান চাইছে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, যেখানে দেশীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনার অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত থাকবে। যদি চুক্তিতে জাপানি কোম্পানিকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা নিরসনে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে হতে পারে, যা একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য সময় ও অর্থ সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রশ্ন উঠছে, আধুনিক প্রযুক্তির বিনিময়ে আমরা কি তবে আমাদের কৌশলগত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চলেছি?
নিরাপত্তার বিষয়টি এই আলোচনার আরেকটি বড় অনুষঙ্গ। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডেটা ম্যানেজমেন্ট, নজরদারি ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা তল্লাশির প্রতিটি স্তর অত্যন্ত গোপনীয় ও স্পর্শকাতর। জাপানি কোম্পানিগুলোকে যখন এই পূর্ণাঙ্গ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখন দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য ও বিদেশি যাত্রীদের তথ্যভাণ্ডার তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। চুক্তিতে এই বিষয়গুলো কতটা স্বচ্ছভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তথ্য সুরক্ষায় কী কী রক্ষা কবজ রাখা হয়েছে, তা এখনো জনসাধারণের কাছে অস্পষ্ট। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বিদেশি শক্তির হাতে দেশের প্রধান বিমানবন্দরের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কতটুকু যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন আজ প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
পরিশেষে, শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে জাপানের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জাপানি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য অনস্বীকার্য, কিন্তু তা যেন দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে না হয়। চুক্তির প্রতিটি ধারা ও উপধারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন যে, সেখানে জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না। সরকারের উচিত এই চুক্তির মূল বিষয়গুলো বিশেষজ্ঞ ও স্টেকহোল্ডারদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা, যাতে ভবিষ্যতে এটি কোনো গলার কাঁটা হয়ে না দাঁড়ায়। উন্নয়ন যেন কেবল চাকচিক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে আরও শক্তিশালী করে, সেই লক্ষ্যেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।






















