ঝগড়ার সময় গালাগালি কেন মা: ভাষার গভীরে লুকিয়ে থাকা সামাজিক অসুস্থতা ও পিতৃতন্ত্রের রূপ
- আপডেট সময়ঃ ০১:০২:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে।

দৈনন্দিন জীবনের রাগ-ক্ষোভ কিংবা তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার দৃশ্য আমাদের সমাজে অত্যন্ত পরিচিত। দুই পক্ষের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে যখন কথার তীর ছোড়াছুড়ি শুরু হয়, তখন খুব দ্রুতই তা ব্যক্তিগত আক্রমণ ছাড়িয়ে পারিবারিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আকস্মিক আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন প্রতিপক্ষের পরিবারের নারী সদস্যরা, বিশেষ করে মা ও বোন। বিরোধ মূলত দুজন পুরুষ বা দুই পক্ষের মধ্যে হলেও, গালিগালাজের কেন্দ্রবিন্দুতে কেন মা বা নারীদের টেনে আনা হয়, তা এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এটি কি কেবলই রাগের মাথায় মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কিছু শব্দ, নাকি এর পেছনে কাজ করছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গেড়ে বসা এক অবচেতন মানসিকতা?
সমাজবিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের গবেষকদের মতে, ভাষা মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। আমরা যেভাবে কথা বলি, তার ভেতরে অবচেতনভাবেই আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও ক্ষমতার কাঠামো প্রতিফলিত হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদেরকে সবসময় পুরুষের ‘সম্পত্তি’ বা পরিবারের ‘সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক’ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। তাই প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে বা তাকে চরমভাবে অপমান করতে তার পরিবারের নারীদের ওপর আক্রমণকে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র বলে মনে করা হয়। মা বা বোনকে নিয়ে কটূক্তি করার মাধ্যমে মূলত প্রতিপক্ষের পৌরুষ, অহংকার এবং তার পারিবারিক নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়। এটি কেবল ভাষার রুচিহীনতা নয়, বরং নারীদের অবমূল্যায়ন করার এক সুগভীর সামাজিক অভ্যাসেরই মৌখিক প্রকাশ।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, রাগের মুহূর্তে মানুষ যখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন সে তার সবচেয়ে আদিম ও সংরক্ষিত আক্রমণাত্মক প্রবৃত্তিগুলোর আশ্রয় নেয়। সমাজ দীর্ঘদিন ধরে শিখিয়ে এসেছে যে, একজন পুরুষের মান-সম্মান নির্ভর করে তার ঘরের নারীদের তথাকথিত ‘পবিত্রতা’ বা শালীনতার ওপর। এই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির কারণে ঝগড়ার সময় আক্রমণকারীরা অবচেতনভাবেই বুঝে নেয় যে, প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি আঘাত দিতে হলে তার দুর্বল জায়গায় আঘাত হানতে হবে, আর তা হলো তার মা বা স্ত্রী-বোনেরা। ফলস্বরূপ, বিরোধের মূল বিষয়বস্তু হারিয়ে গিয়ে আক্রমণটি রূপ নেয় সরাসরি নারী প্রজাতির ওপর এক ধরনের মানসিক ও ভাষিক সহিংসতার, যা আমাদের সামগ্রিক সভ্যতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ভাষা ও সংস্কৃতির এই অসুস্থ চর্চা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাভাবিকীকরণ বা নরমালাইজেশন হয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা চারপাশের পরিবেশে এই ধরনের গালিগালাজ শুনতে শুনতে বড় হয়, ফলে একসময় এগুলোকে আর অপরাধ বা অনৈতিক মনে হয় না। এমনকি অনেক সময় নারীরাও এই পিতৃতান্ত্রিক ভাষার চর্চায় অজান্তেই অংশ নেন, যা আরও বেশি উদ্বেগজনক। আমাদের দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় যে পরিমাণ নারীবিদ্বেষী ও অবমাননাকর শব্দ রয়েছে, তা সমাজের নারীবিরোধী কাঠামোরই প্রাত্যহিক প্রতিচ্ছবি। এই চর্চা প্রমাণ করে যে, সমাজে নারী এখনও পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদার আসন পায়নি, বরং তাকে ব্যবহার করা হয় প্রতিশোধ বা অপমানের হাতিয়ার হিসেবে।
এই অবস্থার উত্তরণে কেবল আইন প্রয়োগ বা সামাজিকভাবে তিরস্কার করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব স্তরেই ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে যে বিরোধ বা মতপার্থক্য যেকোনো মানুষের সঙ্গেই হতে পারে, কিন্তু সেই বিরোধ মেটাতে গিয়ে অন্যের মা বা নারীদের অপমান করা কেবল দুর্বলতার লক্ষণই নয়, বরং এটি একটি অপরাধমূলক মানসিকতা। সমাজকে যদি সত্যিকার অর্থে সভ্য ও সমতাভিত্তিক করে তুলতে হয়, তবে ভাষার এই পিতৃতান্ত্রিক ও অবমাননাকর শিকড় সপাটেই উপড়ে ফেলতে হবে।






















