০৯:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

রান্নার হাঁড়িপাতিলে বিষাক্ত সিসা: ঘরে ঘরে নীরব বিষক্রিয়া, নেই কোনো তদারকি

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময়ঃ ০৬:০১:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৯ বার পড়া হয়েছে।

প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা রান্নাঘর, যেখান থেকে পরিবারের সদস্যদের সুস্থ বেঁচে থাকার পুষ্টি জোগানো হয়। অথচ সেই হেঁশেল থেকেই প্রতিদিন পরিবেশন করা হচ্ছে নীরব এক মারণবিষ। দেশের স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া নিম্নমানের পুনর্ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল ও রান্নার তৈজসপত্রে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর সিসার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। গবেষকদের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অসচেতনতা এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে এই বিষাক্ত ধাতু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নিম্নমানের পাত্রে রান্না করা খাবার নিয়মিত গ্রহণের ফলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অপূরণীয় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে, অথচ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি দেখা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং দেশীয় গবেষকদের যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক আঁতকে ওঠার মতো তথ্য। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, এ ধরনের সস্তা ও ভেজাল মিশ্রিত পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশুর শরীরে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারিত দৈনিক সহনশীল মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা প্রবেশ করতে পারে। কেবল চাল বা পানিতে নয়, রান্নার উচ্চ তাপমাত্রায় পাত্রের সিসা গলে সরাসরি খাবারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অজান্তেই তাদের সন্তানদের প্রতিদিন তীব্র বিষক্রিয়ার মুখোমুখি করছে। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি সিসা গ্রহণের এই হার জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সিসার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আইসিডিডিআর,বি সতর্ক করে জানিয়েছে, এটি একটি মারাত্মক ভারী ধাতু যা মানবদেহের কোনো কাজেই আসে না, বরং শরীরের অভ্যন্তরে জমে গিয়ে স্থায়ী ক্ষতি সাধন করে। বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক বিকাশে সিসা দীর্ঘমেয়াদি এবং অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ডেকে আনে। এর ফলে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ) হ্রাস পায়, মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয় এবং শেখার ক্ষমতা চিরতরে বাধাগ্রস্ত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, রক্তে সিসার উপস্থিতি শিশুদের আচরণগত সমস্যা এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা তৈরির পেছনেও বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব কিংবা ত্রুটিপূর্ণ নবজাতকের জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বিকল এবং হৃদরোগের কারণ হতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বিপজ্জনক তৈজসপত্র তৈরির প্রধান কাঁচামাল আসছে অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার খাত থেকে। গাড়ির পুরোনো ব্যাটারি, বাতিল হওয়া ভারী যন্ত্রাংশ, রেডিয়েটর এবং বিষাক্ত ধাতব বর্জ্য গলিয়ে কোনো ধরনের পরিশোধন বা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়াই তৈরি হচ্ছে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল। দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ছোট ছোট রি-রোলিং মিল ও ঢালাই কারখানায় প্রকাশ্যে এই বিষ বাণিজ্য চললেও তা বন্ধে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ নেই। অত্যন্ত কম খরচে তৈরি হওয়ায় এবং বাজারে আকর্ষণীয় পালিশ দিয়ে বিক্রি করায় সাধারণ ক্রেতারা কোনো কিছু না জেনেই এসব পাত্র কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যেসব শিল্পোৎপাদনে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ দরকার ছিল, সেখানে চলছে চরম নৈরাজ্য।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাজারজাত হওয়া খাদ্যদ্রব্য নিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু অভিযান চালানো হলেও রান্নার এই বিষাক্ত পাত্রগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ কিংবা খোঁজে নেওয়ার যেন কেউ নেই। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কিংবা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারির তালিকায় এখনো পাত্রের ধাতব বিশুদ্ধতা বিষয়টি উপেক্ষিত। কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না থাকায় উৎপাদনকারীরা যা খুশি তাই বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে। গবেষক ও নীতি-বিশ্লেষকদের মতে, এখনই ফুড-গ্রেড অ্যালুমিনিয়ামের কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ, অননুমোদিত ঢালাই কারখানা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি না করলে এক পঙ্গু ও দুর্বল মেধার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়ভার দেশকে বহন করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

রান্নার হাঁড়িপাতিলে বিষাক্ত সিসা: ঘরে ঘরে নীরব বিষক্রিয়া, নেই কোনো তদারকি

আপডেট সময়ঃ ০৬:০১:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা রান্নাঘর, যেখান থেকে পরিবারের সদস্যদের সুস্থ বেঁচে থাকার পুষ্টি জোগানো হয়। অথচ সেই হেঁশেল থেকেই প্রতিদিন পরিবেশন করা হচ্ছে নীরব এক মারণবিষ। দেশের স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া নিম্নমানের পুনর্ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল ও রান্নার তৈজসপত্রে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর সিসার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। গবেষকদের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অসচেতনতা এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে এই বিষাক্ত ধাতু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নিম্নমানের পাত্রে রান্না করা খাবার নিয়মিত গ্রহণের ফলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অপূরণীয় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে, অথচ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি দেখা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং দেশীয় গবেষকদের যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক আঁতকে ওঠার মতো তথ্য। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, এ ধরনের সস্তা ও ভেজাল মিশ্রিত পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশুর শরীরে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারিত দৈনিক সহনশীল মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা প্রবেশ করতে পারে। কেবল চাল বা পানিতে নয়, রান্নার উচ্চ তাপমাত্রায় পাত্রের সিসা গলে সরাসরি খাবারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অজান্তেই তাদের সন্তানদের প্রতিদিন তীব্র বিষক্রিয়ার মুখোমুখি করছে। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি সিসা গ্রহণের এই হার জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সিসার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আইসিডিডিআর,বি সতর্ক করে জানিয়েছে, এটি একটি মারাত্মক ভারী ধাতু যা মানবদেহের কোনো কাজেই আসে না, বরং শরীরের অভ্যন্তরে জমে গিয়ে স্থায়ী ক্ষতি সাধন করে। বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক বিকাশে সিসা দীর্ঘমেয়াদি এবং অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ডেকে আনে। এর ফলে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ) হ্রাস পায়, মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয় এবং শেখার ক্ষমতা চিরতরে বাধাগ্রস্ত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, রক্তে সিসার উপস্থিতি শিশুদের আচরণগত সমস্যা এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা তৈরির পেছনেও বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব কিংবা ত্রুটিপূর্ণ নবজাতকের জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বিকল এবং হৃদরোগের কারণ হতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বিপজ্জনক তৈজসপত্র তৈরির প্রধান কাঁচামাল আসছে অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার খাত থেকে। গাড়ির পুরোনো ব্যাটারি, বাতিল হওয়া ভারী যন্ত্রাংশ, রেডিয়েটর এবং বিষাক্ত ধাতব বর্জ্য গলিয়ে কোনো ধরনের পরিশোধন বা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়াই তৈরি হচ্ছে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল। দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ছোট ছোট রি-রোলিং মিল ও ঢালাই কারখানায় প্রকাশ্যে এই বিষ বাণিজ্য চললেও তা বন্ধে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ নেই। অত্যন্ত কম খরচে তৈরি হওয়ায় এবং বাজারে আকর্ষণীয় পালিশ দিয়ে বিক্রি করায় সাধারণ ক্রেতারা কোনো কিছু না জেনেই এসব পাত্র কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যেসব শিল্পোৎপাদনে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ দরকার ছিল, সেখানে চলছে চরম নৈরাজ্য।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাজারজাত হওয়া খাদ্যদ্রব্য নিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু অভিযান চালানো হলেও রান্নার এই বিষাক্ত পাত্রগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ কিংবা খোঁজে নেওয়ার যেন কেউ নেই। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কিংবা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারির তালিকায় এখনো পাত্রের ধাতব বিশুদ্ধতা বিষয়টি উপেক্ষিত। কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না থাকায় উৎপাদনকারীরা যা খুশি তাই বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে। গবেষক ও নীতি-বিশ্লেষকদের মতে, এখনই ফুড-গ্রেড অ্যালুমিনিয়ামের কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ, অননুমোদিত ঢালাই কারখানা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি না করলে এক পঙ্গু ও দুর্বল মেধার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়ভার দেশকে বহন করতে হবে।