রাজপথে লাশের মিছিল ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন: সাত বছরে ৩০০ পরিবারের মর্মান্তিক সমাপ্তি
- আপডেট সময়ঃ ০৮:০১:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৪ বার পড়া হয়েছে।


বাংলাদেশের সড়ক যেন এক অনিয়ন্ত্রিত মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য তাজা প্রাণ অকালে ঝরে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত ছয় বছর ১০ মাস অর্থাৎ প্রায় সাত বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০০টি পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একটি পুরো পরিবার যখন চোখের পলকে রাজপথের ধুলোয় মিশে যায়, তখন তা কেবল একটি সংখ্যা হয়ে থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতার এক চরম নিদর্শন। দেশের একটি নির্ভরযোগ্য বেসরকারি সংস্থার এই প্রতিবেদনটি জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। সড়ক নিরাপত্তার অভাব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের নেই। বিরামহীন এই মৃত্যুর মিছিল কেবল চালকের অসতর্কতা নয়, বরং সড়ক অব্যবস্থাপনা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্যের এক সম্মিলিত ফল।
উক্ত পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সাত বছরে ৩০০টি পরিবার নিশ্চিহ্ন হওয়ার অর্থ হলো—মা-বাবা, ভাই-বোন বা স্বামী-স্ত্রীসহ পুরো ঘরটি এখন জনশূন্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা ভ্রমণে যাওয়ার পথে এক নিমেষেই শেষ হয়ে গেছে একটি বংশের প্রদীপ। এই ধরনের দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ওভারটেকিং প্রবণতা এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের দৌরাত্ম্য প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমাদের দেশের সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও এর প্রয়োগ অত্যন্ত শিথিল। আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি না করার ফলে রাজপথে নৈরাজ্য থামছে না। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের প্রভাবের কারণে প্রকৃত দায়ীদের শাস্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সড়কের এই রক্তক্ষরণ থামাতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়ংকর বাস্তবতার মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উত্তপ্ত হওয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের সাথে বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন বা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং গত দেড় দশকের বিভিন্ন ঘটনার বিচারিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকার দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের এই প্রত্যর্পণ চুক্তির কার্যকারিতা এখন বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। একদিকে দেশে সড়কের বিশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার সংকট, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষমতাচ্যুত নেতৃত্বের বিচার নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ—উভয় দিক থেকেই সরকার এক ক্রান্তিকাল পার করছে। ভারতের পক্ষ থেকে এই অনুরোধের কী জবাব আসে, তার ওপর নির্ভর করছে দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের মেরুকরণ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা যেমন জরুরি, তেমনি জননিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজপথের নৈরাজ্য বন্ধ করাও সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। মানুষ কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং জীবনের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের সংমিশ্রণ দেখতে চায়। গত সাত বছরে যে ৩০০টি পরিবার ধুলোয় মিশে গেছে, তাদের শোকসন্তপ্ত স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকেই প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, যদি সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের নূন্যতম নিরাপত্তা না থাকে। সড়ক দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হওয়ার মতো ঘটনা সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। একইসাথে, রাজনৈতিক পালাবদলের এই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ রাখা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিজ্ঞানসম্মত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে আইনের শাসন কায়েম করাই এখন সময়ের দাবি। রাজপথের রক্ত বন্ধ না হলে এবং অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত না হলে, সাধারণ মানুষের মাঝে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়বে। জননিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ন্যায়বিচার—এই দুই সমান্তরাল পথেই বাংলাদেশকে আগামীর সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।






















